2.2 C
New York City
Tuesday, January 28, 2020
Home অন্যান্য নরখাদক খইল্লা পাগলা ও শিউরে ওঠা বাংলাদেশ

নরখাদক খইল্লা পাগলা ও শিউরে ওঠা বাংলাদেশ

ঘটনাটা ইউরোপ কিংবা নিদেনপক্ষে ভারতে হলেও এতদিনে লোমহর্ষক কোনো পর্দা কাঁপানো ছবি নির্মান হয়ে যেত। বলছিল ৭০ দশকের কথা। আজ যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না, তেমনই একটা ব্যাপার ঘটেছিল সেই সময়। ঘটনার মূল কূশীলব হলেন বাংলাদেশের এক খলিলুল্লাহ।

১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিলের কথা। তৎকালীন শীর্ষ পত্রিকা দৈনিক বাংলার একটি বক্স আইটেম গোটা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পাঠকের চোখ কপালে উঠে যায়। শিউরে ওঠে গোটা বাংলাদেশ। খবরের ছবিতে দেখা যায় এক যুবক মরা একটি লাশের চেরা বুক থেকে কলিজা বের করে খাচ্ছে – কী বিভৎষ এক দৃশ্য। ভাবতেই গা গুলিয়ে যাচ্ছে!

খবরের শিরোনাম ছিল – ‘সে মরা মানুষের কলজে মাংস খায়!’ সেই মানুষটি হল খলিলুল্লাহ। সবাই চেনে খইল্লা পাগলা নামে। খবর প্রকাশের দু’দিন পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। গ্রেপ্তার করা হয় খলিলুল্লাহ নামের এই নরখাদককে। চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে।

১৯৭৫ সালের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার রেশ অনেকদিন ছিল। লোকেমুখে সেই ঘটনার কেথা শোনা যেত। ‘ওই মাংস না খাইলে পাগল অইয়া যাইমু’ খইল্লা পাগলার এমন একটা কথা বেশ ঝড় তুলেছিল। যদিও, আলোচনাটি হারিয়ে যেতে সময় লাগেনি।

তবে, ঠিক ২২ বছর পর আবারো আসেন খলিলুল্লাহ। তবে, এবার তিনি আগের সেই খইল্লা পাগলা নেই।

১৯৯৭ সালের ঘটনা। আজিমপুর কবরস্থান। এক পত্রিকার প্রতিবেদকের সাথে সাবেক ‘নরমাংস খেকো‘ খলিলুল্লাহর দেখা হয় কবরস্থানের গেটে। আগের চেয়ে অনেকটাই পাল্টে গেছেন। লম্বা, বয়সের ভারে কিছুটা কুঁজো, চাপ দাড়িওয়ালা, লুঙ্গি-শার্ট পরা খলিলুল্লাহকে চেনা মুশকিল। নিজেকে অবশ্য সুস্থই দাবি করেছিলেন তখন।

তবে সুস্থ হলে তখনো কেন কবরস্থানের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন? – এই কৌতুহল জাগাটা স্বাভাবিক। খলিল জানান, তার কোনো আত্নীয়স্বজন বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সন্ধান জানে না। কেউ তার খোঁজ নিতেও আসেনি। এর কারণে কবরস্থানের এখানে-সেখানে সে ঘুরে বেড়ায়।

মানুষ তার পরিচয় পেয়ে দুই-চার টাকা সাহায্য দেয়। তাতে পেট চলে যায়। রাতে কবরস্থানের বাইরে কোনো জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ে।

মানুষের মাংস ও কলিজা খাওয়ার ব্যাপারে এখন কথা বলতেই দ্বিধা করে খলিল। পরে তাকে পেটপুরে খাওয়ানো হয়। পেটে খাবার পড়ায় যেন মুখে ফুলঝুড়ি ফোটে খলিলের। অনর্গল বলতে থাকে পুরনো দিনের কথা।

তবে ঠিক কেন সে নরমাংস খেত? – এই প্রশ্নের জবাব ছিল না খলিলের কাথে। তবে প্রতিবেদকের কাছে জানায়, পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসায় সে ভালো হয়ে যায়; কিন্তু কলিজাখেকো বলে কেউ তাকে কাজ কিংবা আশ্রয় দেয়নি।

খলিল দাবী করে, অনেকে শারীরিকভাবে আঘাতও করেছে। যার জন্য শুধু বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে কবরস্থানকে বেছে নিয়েছে। তবে মরা মানুষের মাংসের লোভে নয়, শুধু নিজেকে সমাজ থেকে দূরে রাখার জন্য। সে বলে, ‘যদি মানুষের মাংস খাওয়ার জন্যই কবরস্থানে আসি, তাহলে তো কবরস্থান কর্তৃপক্ষ অনেক আগেই তাড়িয়ে দিত।’

তবে, ২২ বছর আগে এই খলিলই এতটা সহজ-সরল ছিল না। ছিল একেবারেই উন্মাত, উন্মত্ত ও হিংস্র। জনৈক প্রতিবেদক যখন খলিলুল্লাহকে বলেছিল – ‘তোকে বেশি বেশি লাশ খেতে দেওয়া হবে!’ তখন সে নাকি লাফ দিয়ে উঠে বলেছিল, ‘স্যার, আমাকে লাশ খেতে দেবেন?’ ‘হা হা’ বলে একটা অট্টহাসিও দিয়েছিল।

তাঁদের মধ্যকার আলাপটা ছিল এমন –

এখন বল তুই সত্যিই লাশ খাস?

-হ, খাই।

কেন খাস?

– ভালো লাগে।

না খাইয়া থাকতে পারস না?

– ওই মাংস না খাইলে পাগল অইয়া যাইমু।

শোন কয়দিন পর পর খাস?

– দুই আঙুল! আঙুল দিয়ে দুই দেখাল।

কয়দিন আগে খাইছিস?

– পরশু দিন। একটা মাইয়া খাইছি।কইলজা স্যার। মুখে হাসি।তেল ভি খাইতে পারি।

কি খাইতে ভালো লাগে, কইলজা না তেল?

– এইখানের মাংস। হাত দিয়ে ঊরু দেখাল।

শোন, আর মাংস খাবি না বুঝলি। আর খাবি?

– খামু।

কেন, তোর খারাপ লাগে না? গন্ধ আসে না?

– হা হা, ভালো লাগে।

এরপর প্রতিবেদক ইয়ার্কি করে জানতে চাইলেন, তুই যে মানুষের মাংস খাস তা কি বাস্তবে দেখাতে পারবি?

সঙ্গে সঙ্গে খলিলুল্লাহ মর্গের ভেতরে ঢুকে ছুরি দিয়ে এক টুকরো মাংস নিয়ে আসে। সঙ্গে কলিজার টুকরো। তার সামনেই পৈশাচিকভাবে কলিজার টুকরো কচকচিয়ে খেতে লাগল।

খলিলউল্লাহ ধরা পড়ার গল্পটাও লোমহর্ষক। খলিলুল্লাহ নরমাংসের নেশায় মর্গে আসতেই হাসপাতাল কর্মচারীরা তাকে ধরে ফেলেন। তারপর তাকে হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক কর্নেল এম এল রহমানের কক্ষে হাজির করা হয়।

কর্নেল সাহেব কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এম এ জলিল ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামাদসহ আরো কয়েকজন মানসিক বিশেষজ্ঞকে জরুরী তলব করেন। তাঁরা খলিলুল্লাহকে অভয় দিয়ে ঘটনা খুলে বলতে বলেন। খলিলের কথায় তখন অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা বেরিয়ে আসে।

তার জবানবন্দিতেই জানা যায়- রবি ডোম ছিল খলিলুল্লাহ ছোটবেলার বন্ধু। তখন সে লালবাগে থাকত। প্রতিদিন হেঁটেই ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আসত। রবি ডোমের বাবা ছিল ঢাকা মেডিকেলের প্রথম ডোম। সেই নাকি খলিলুল্লাহ ও রবি ডোমকে প্রথম মরা মানুষের মাংস খেতে দিত। পরে রবি ডোম নরমাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়। কিন্তু, খলিলুল্লাহ ছাড়তে পারেনি।

বরং খলিলুল্লাহ’র নেশা আরো বাড়ে। অন্তত, পাঁচ দিন পর পর তার নরমাংস লাগবেই। শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, মিটফোর্ড হাসপাতালের গোপাল ডোম ও সোনা ডোমের সাথেও সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। তারাও তাকে মরা মানুষের মাংস খেতে দেয়।

নরমাংস ছাড়াও লাশের কাফনের কাপড় চুরি করা ছিল তার নেশা। ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে কবর খুঁড়ে কাপড় এনে তা মৌলভীবাজারের কাছাকাছি পুরনো কাপড়ের দোকানে বিক্রি করত। কাপড় বিক্রির টাকা দিয়ে স্বাভাবিক খাবার খেত।

খলিলুল্লাহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আরো বলেছে, সে তার খালা মমিনাকে মানুষের মাংস খাসির মাংস বলে রান্না করে খাইয়েছে। এসব তথ্য শুনে কর্তৃপক্ষ রীতিমতো হতবাক হয়ে যায়। এরপর তাৎক্ষণিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের রান্নাঘর থেকে মুরগির কাঁচা মাংস এনে দেওয়া হয় তাকে।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে মুরগির কাঁচা মাংস চার ডাক্তারের সামনেই চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, খলিলুল্লাহকে আর জনসমক্ষে রাখা যায় না। তাঁরা ধারণা করছিল, প্রাণঘাতি হয়ে উঠতে পারে খলিল। পুলিশ ডেকে তাই তাকে রমনা থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

শুরু হয় নতুন করে পুলিশি জেরা। কিন্তু পুলিশকে বোকা বানিয়ে খলিলুল্লাহ দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে, সে মানুষের মাংস খায়, ভবিষ্যতেও খাবে। এ ঘোষণার ভেতর দিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়, খলিলুল্লাহ কোনো দাগী ক্রিমিনাল নয়, একজন জটিল মানসিক রোগী।

মানসিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়। সবকিছু শুনে বিচারক খলিলুল্লাহকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।

খলিলুল্লাহ পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ঢাকায় আসে; কিন্তু মানুষের মাংস খাওয়ার অপবাদ তার কপাল থেকে যায়নি। কোথাও গেলে তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো।

মহল্লার লোকজন ইট দিয়ে তাকে আঘাত করত। ঘৃণায় তাকে কেউ কাজ দিত না। যার কারণে আজিমপুর করবস্থানের গেটে বসে সে ভিক্ষা করত। সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়েই সে কবরস্থানের ভিক্ষুকদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল।

মানুষের কাছে হাত পেতে খাবার সংগ্রহ করত। সব সময় চুপচাপ বসে সে যেন কী ভাবত। কাউকে ধমক দেওয়া কিংবা গালি দেওয়ার কথা শোনা যায়নি। তবে তার চোখমুখের দিকে তাকালে বোঝা যেত, একসময় মানুষটি হিংস্র ছিল। চোখের ভাষায় বলে দিত তার পক্ষে লাশ খাওয়া অসম্ভব ছিল না।

সবার কাছে সে খইল্লা পাগলা নামে পরিচিত ছিল। তবে কখনো তাকে পাগলামি করতে দেখা যায়নি। গেট পেরিয়ে কবরস্থানে তাকে কখনো ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এমনকি সেও কখনো কবরস্থানের ভেতরে ঢোকার আবদার করেনি।

পরে অবশ্য বিয়ে করেছিল, বাবাও হয়েছিল। ২০০৫ সালে মারা যায় খলিলুল্লাহ! মৃত্যুটাও নাকি তাঁর হয়েছে অর্থের অভাবে।

সন্তানদের প্রতি নাকি তাদের ভালবাসার কোনো কমতি ছিল না। খলিলুল্লাহর স্ত্রী নূরজাহান বেগম কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলবাগের এক বস্তিতে থাকতেন। দুই ছেলে রমজান আলী ও রাজ্জাক হোসেন দিনমজুর। তবে, নূরজাহান বা তাঁর ছেলেরা সমাজের ভয়ে খলিলুল্লাহর পরিচয় গোপনই রাখেন!

আরিফুল আলম জুয়েল
অলিগলি.কম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন গ্রেফতার রিমান্ড চাইবে পুলিশ

নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানা কুতুবপুর ইউনিয়নের কুখ্যাত সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন হাওলাদার গ্রেপ্তার হয়েছেন। ছাগল চুরির অভিযোগে দুই যুবককে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায়...

ছাত্ররাজনীতি : প্রত্যাশার আলাপন

ফিরে আসুক ছাত্র রাজনীতিতে স্বচ্ছতা!! চলমান রাজনীতিকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র নেতাদের ব্যবহার করার চেষ্টা করার পায়তারা...

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হাসিব ও মুরছালিনের মিছিল নিয়ে যোগদান

শনিবার (৪ জানুয়ারি) ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের উদ্যোগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ...

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করলো নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ

বিশ্বের সর্ব বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন হিসেবে সুপরিচিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করলো নারায়নগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গতকাল সন্ধ্যায়...

Recent Comments