1. [email protected] : abir :
  2. [email protected] : Mohin Soy : Mohin Soy
  3. [email protected] : Narayanganj Tribune : Narayanganj Tribune
  4. [email protected] : Sifat Sikder : Sifat Sikder
October 22, 2021, 4:08 pm

নারায়ণগঞ্জ পানাম নগরের কুলুঙ্গিওয়ালা বাড়ি

Reporter Name
  • Update Time : Friday, March 12, 2021

স্বচ্ছল হিন্দু বসতবাড়িতে পূজা অর্চনার জন্য ‘ঠাকুর ঘর’ নামের ভিন্ন একটি ঘর রাখার প্রচলন আছে। এটা অসাধারণ কিছু নয়। কিন্তু পানাম  নগরের ‘ঠাকুর ঘর’ দুইটি একটু ভিন্ন। এ জন্যই বিশেষ নজর যায় বাড়ি দুটির দিকে। ঘর দুটির যে আকার আকৃতি, তাতে একে ‘ঠাকুর ঘর’-এর চাইতে  ‘ঠাকুর কুঠুরি’ বললেই মানানসই হয় বেশী।

দুটি ঘরই পাকা। কিন্তু আকৃতি দোচালা ঘরের। দু’টি বাড়িরই দোতলায়, সমুখে আবার উঠোন মতো ছাদ ছাড়া উন্মুক্ত একটু জায়গা আছে। দোচলা ঘর নুতন কিছু নয় এদেশে। এখনও পল্লীগ্রামে মাঝে মধ্যেই চোখে পড়ে, সেমি পাকা বা ঢেউ টিনের। মাটির দেয়াল বা বাঁশের তরজার বেড়ার উপর ছন বা খড়ের দোচালা চোখে পড়ে কদাচিৎ।

কিন্তু এ রকম সোজা সরল সাধারণ দোচালা নয় পানাম নগরের ঘর দুটি। এই দু’টির কিনার ও চুড়া দুই প্রান্তে নামানো ধনুকের মতো বাঁকিয়ে। এটাই এ ধরণের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট।

পানাম নগর ১৩ নং বাড়ি দোচালা ঠাকুর কুঠুরি

দোতলাতে বিশেষ আকৃতির এই ঘরটির জন্যই বাড়ি দুটি নজরে পড়ে বিশেষ করে। বাড়ি দুটিই রাস্তার মাঝামাঝি, উত্তর পাশে  ৩১ নং দক্ষিণ পাশে ১৩ নং বাড়ি। বসত ঘরে নয়, সাধারণত মন্দিরে বা মসজিদেই প্রচলন এমন বাঁকানো কিনার ও চুড়ার দোচালা ঘরের।

পাবনার রাধানগরের জোড় বাংলা মন্দির অথবা যশোহরের এগারো শিব মন্দিরে বিশেষ পরিচিতি এমন শৈলীর দোচালার কারণেই। আবার একই কারণে বিশেষ পরিচিতি কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্দুরের শাহ মাহমুদ মসজিদ অথবা রাজশাহীর কিসমত মারিয়া মসজিদের।

এগারোসিন্দুরের শাহ মাহমুদ মসজিদ ও বালাখানা

মন্দিরের ক্ষেত্রে দোচালা স্থাপনাটি মূল দেবালয় বা উপাসনালয়। কিন্তু মসজিদের দোচালাগুলো মূল উপাসনালয় নয়। শাহ মাহমুদ মসজিদে এমন দোচালা ছাদ আছে পুকুরের ঘাটলাতে।

নিখাদ বঙ্গীয় স্থাপত্যের প্রকৃষ্টতম উদাহরন বলা যায় দোচালাকে। এমন আদর্শ দোচালা ঘর হচ্ছে মাটির দেয়াল, বাঁশের ফ্রেমে ছন খড় বা গোলপাতার ছাউনি। তবে এই চালা বাঁকানো নয়, সোজা।

নেত্রকোনা জিলার বারহাট্টার কাশতলা গ্রামের ( কবি নির্মলেন্দু গুণের গ্রাম) একটি সাধারণ দোচালা ঘরের বাড়ি

বাঁকানো চালা করা হতো উপাসনালয়ের মতো বিশেষ স্থাপনায়। তাও দেখতে পাওয়া, এখন পর্যন্ত টিকে থাকা, সবগুলোই চুন সুড়কির। ছনের বা খড়ের নয় কোনটাই। একটি জায়গাতে দেখা আছে বাঁশের ফ্রেমে এমন বাঁকানো ছনের দোচালা।  তাও ছন ছিলো ১৯৭১ এর আগে। স্বাধীনতার পর কোন এক সময় মেরামতকালে টিন লাগানো হয়েছে ছনের  বদলে। এই ওড় মন্দিরের প্রান্ত বেঁকে এসে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে ভূমি! এটি হবিগঞ্জ জিলার বানিয়াচং থানার বিথঙ্গল গ্রামের রামকৃষ্ণ আখড়ার জোড় মন্দির।

বিথঙ্গল গ্রামের দোচালা জোড় মন্দির

তবে এমন দোচালা চুন সুড়কির  ঘরের সর্বশেষ নির্মান সম্ভবত শো দেড় শো বৎসর আগের। এই ধরণের মন্দির নির্মানের সীমাবদ্ধতা সম্ভবত এর সম্ভাব্য আকার। এই পদ্ধতিতে খুব একটা বড় আকারের মন্দির নির্মানের নজির নেই। আজকাল আবার বড় হওয়া চাই সব কিছু। তাই এই পদ্ধতি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে মন্দির নির্মানে ।

তাই এমন নির্মানশৈলী বিলুপ্তই বলা যায় এক রকম। যা কিছু আছে, এক শো, দু শো বৎসর আগের বা তারও চাইতে প্রাচীন।

গৃহ কাঠামোর তেমনই আরেক বিলুপ্ত গৃহস্থালী অংশ কুলুঙ্গি। এই কুলুঙ্গিও আছে পানাম নগরের এই ৩১ নং বাড়িটিতে। কুলুঙ্গি মানে দেয়াল কোঠরে চৌকোণা চতুর্ভুজ অথবা দোচলা ঘরের আকৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোঠর। তখন কুলুঙ্গি ছাড়া এমন ঘর থাকতো না। প্রদীপ, আরশি , চিরুণী, পুস্তক, চশমা, স্লেট – পেন্সিল রাখার জায়গা ছিলো এসব কুলুঙ্গি। এমন কুলুঙ্গির জন্য দেয়াল থাকতে হতো অন্তত বিশ পঁচিশ ইঞ্চি পুরু। এই বাড়ির নীচতলায়  পাশাপাশি ছোট কুঠুরির মতোই ঘর। এই ঘরের দেয়ালে দেয়ালে সারি বাধা কুলুঙ্গি।  

পানাম নগরের ৩১ নং বাড়ির সারি বাধা কুলুংগি

গৃহস্থালি ছোট খাটো প্রাত্যাহিক ব্যবহার্যের এমন অনেক কিছুই বিলুপ্ত আজকাল । তেমন কিছু দ্রব্যের উল্লেখ এখন পাওয়া যায় শুধুই আগেকার লিখা গল্প কথা কবিতা প্রবন্ধে।

তেমনই কিছু দ্রব্যের উল্লেখ আছে কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর ‘ভিতর-বাড়িতে রাত্রি’ কবিতায় । আছে কুলুঙ্গির মতো বিলুপ্ত – কুয়োতলা, কুজো।

“কোথায় কবাট-জানালা, উঠোন, মন্দির, কুয়োতলা,

কুলুঙ্গি, ঘোরানো সিঁড়ি, বারান্দা, জলের কুঁজো। ” 

এই পানাম নগরের অন্যান্য অনেক বাড়ির মতোই অতি সামান্যই অবশিষ্ট আছে ছবির বাড়িটির। বারো আনা ভেঙ্গে চুরে মাটিতে মিশে যেয়ে টিকে থাকা চার আনা অংশের ছবি এটি।

আজকাল বাড়িঘরে কুলুঙ্গি রাখা হয় না, কারণ কুলুঙ্গির depth এর সংকুলান করার মতো পুরু দেয়ালই হয়না। আর এমন বাঁকানো দোচালার নির্মানেরও সাম্প্রতিক নজির নেই। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে  নুতনই বলা চলে পানাম নগরের এই দোচালা-কে।

পানাম নগরের টিকে থাকা ৫০ / ৫৫ টি বাড়ির মাঝে দু টো বাড়িতে এখনও অক্ষয় আছে দেয়ালে সাঁটানো পিতলের প্লেটে / খোদাই করা নির্মান সাল । এর মাঝে কাশীনাথ ভবন নামের ৩৩ নং বাড়িটির নির্মান সাল ‘সন ১৩০৫ ‘ । ১৬ নং বাড়িটির ‘১৩৩৫ সন’। এই সন মানে বঙ্গাব্দ।

ভবনগুলোর নির্মানশৈলীই বলে দেয়, প্রায় সমসাময়িক এই বাড়িগুলো। সেই সময়ে নির্মান করা বাড়ি ঘরের এতো তাড়াতাড়ি, মানে শো -দেড় শো বৎসরে এভাবে ভেঙ্গে পড়ার কথা নয়। পঞ্চাশের দশক হতে একে একে বাড়িগুলো ফেলে দেশ ত্যাগের পর দিনে দিনে একে একে বাড়ি গুলো দখলে নেয় প্রভাবশালী রা । বাসিন্দারা পরিত্যাগ করে চলে যাওয়ার পর দখলদারদের ইট কাঠ দরজা জানালা খুলে নেয়াতেই এই অবস্থা।

এটা শুধু পানাম নগর কেন, এটাই কালচার এখানকার। পাহারা দিয়েই রাখা যায় না, এগুলোতো ছিলো সবার জানা ‘মালিক নাই বিল্ডিং’ । নানান মহলের নানান কথাবার্তায় সরকার তথা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কুম্ভ নিদ্রার অবসান ঘটে ২০০৯ সালে। সে সময় অবৈধ দখল মুক্ত করা হয় বাড়ি গুলো, সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয় পানাম নগরকে।

বঙ্গাব্দ এখন চলছে ১৪২৭ সাল। কাশীনাথ ভবন-এর নির্মান সাল ‘সন ১৩০৫ ‘ এর পর অতিক্রান্ত হয়েছে ১২২ বৎসর। এমন দোতলায় এমনই সমুখে দোতলাতে উন্মুক্ত ‘উঠোন’ রাখা দোচালা ঠাকুর কুঠুরি বাড়ির অপরটি হচ্ছে ১৩ নাম্বার বাড়ি।

২০০৯ তে দখলিমুক্ত করার ১১ বছর পর ২০২০ সালে শুরু হয় পানাম নগরের প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি গুলোর রিস্টোরেশন কাজ, গত দু’ দিন আগে ২১/১২/২০২০ তারিখে। এই কাজটি শুরু হয় উপরে উল্লেখ করা ১৩ নম্বর বাড়িটি দিয়ে।

যা হারিয়ে গেছে, তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। পুণরুদ্ধার কতটুকু হবে, তা বুঝা যাবে কাজ সমাপ্তির পর। মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ঠ্য চাপা না দিলেই হয় আরও সুন্দর করতে বা বাড়তি ‘সৌন্দর্য্য’ যোগ করতে যেয়ে। যেটুক এখনও আছে, সেটুক রক্ষা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শুধু প্রহরা দিয়ে রাখা নয়, টিকা থাকা কাঠামোকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা দরকার।

বাড়ির যে নাম্বার বলছি, এ নাম্বার পানাম নগরের ধ্বংসোন্মুখ বাড়িগুলোতে দেয়া প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের দেয়া নাম্বার।

দেশ-বিদেশঃ কৃষ্টি ও ঐতিহ্য

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 TV Site
Develper By ITSadik.Xyz